অস্তিত্ব বিলীনের দ্বারপ্রান্তে নওগাঁর দুবলহাটি রাজবাড়ি

রাজা যেমন রাজ্যটাকে রাখে চোখে চোখে। তেমনি আমি রাখব তোমায়, ... গানটির অস্তিত্ব থাকলেও শুধু অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

 দুবলহাটি রাজবাড়িটি। কালের সাক্ষী এই রাজবাড়িতে নেই রাজা-রাণীপ্রজা আর পেয়াদাদের চলাচল।রাজসিংহাসন বা রাজার কোন আইন বা শাসন প্রথাও নেই। তবেস্বগৌরবে এখনও দাঁড়িয়ে আছে ভঙ্গুরশীর্ণ সুবিশাল অট্টালিকাটি। সোয়াদুশ বছরের পুরোনো এই বিশাল প্রাসাদটি প্রায় পাঁচ একর 

এলাকাজুড়ে বিস্তির্ণ। কেবলমাত্র সংরক্ষণ  সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক এই রাজবাড়িটি 

আজ বিলুপ্তির পথে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাঅযত্ন  অবহেলায় ঐতিহাসিক এই প্রাসাদটি যেকোনও সময় ধ্বসে পরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।বৃষ্টির পানিতে রাজবাড়ির দেয়াল দেবে গেছে। ছাদ চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি। এজন্য প্রাসাদটির দেওয়াল আর ছাদটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পরেছে। এতে যেকোন সময় ঘটতে পারে অঘটন।




রাজবাড়িটি নওগাঁ শহর থেকে মাত্র  কিলোমিটার দক্ষিণে

 দুবলহাটি ইউনিয়নে অবস্থিত। বর্তমানে এই বিশাল দালানটি মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আর দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে প্রসাদটি। এছাড়াও নির্দ্বিধায় চলছে অসামাজিক কার্যকলাপ।অনেকেই ভূতুড়ে বাড়ি বলে প্রাসাদের সামনের অংশ দেখে চলে যান। তবে এই বিশাল অট্টলিকায় আগের আমলের কোন দরজা বা জানালার 

অস্তিত্ব মেলা ভার। অভিযোগ রয়েছেস্থানীয়রা এখন দালান থেকে ইটও খুলে নিতে শুরু করেছে। দালানটির দ্বিতীয় তলায় ওঠা এখন খুবই ঝূঁকিপূর্ণ ব্যাপার। দেখভালের অভাবে ভবণটি পশ্চিম দিকের একটি অংশ দুবার ভেঙ্গে গেছে। প্রাসাদটির দেখাশুনা করার মত কেউ নেই এখন। ফলে ঐতিহাসিক প্রাসাদটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।




সরেজমিনে দেখা গেছেমূল ফটকের সাথে লাগানো ছোট 

একটি কাঠের তৈরি পকেট দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করছে দর্শনার্থীরা। দেয়ালের কোথাও কোথাও আবার মাটির প্রলেপ দেয়া। দোতলায় উঠে দক্ষিণ পাশ থেকে উত্তর পাশে আসার জন্য

 একটি বাঁশের সাঁকো বানানো হলেও সেটির বেশিরভাগ অংশই এখন ভাঙ্গা। দোতলার ছাদের বেশিরভাগ জায়গা ধ্বসে গেছে। ছাদ স্যাঁতস্যাঁতে থাকায় তা পিচ্ছিল আর নতুন আগাছা গজিয়ে জঙ্গলে 

পরিণত হয়েছে।




জানা গেছেরাজা কৃষ্ণনাথ ১৭৯৩ সালে এই অঞ্চলটিতে শাসনকার্য শুরু 

করেন .তৎকালীন বৃটিশ লর্ড কর্নওয়ালিসের কাছ থেকে ১৪ লাখ  শত ৯৫ টাকায় জায়গাটি কিনেছিলেন তিনি।কৃষ্ণনাথ ছিলেন একজন নিঃসন্তান রাজা।এজন্য নিঃসন্তান হওয়ায় ১৮৫৩ সালে এই রাজ্যের নতুন রাজা নির্বাচিত হোন তাঁর দূরসম্পর্কের নাতি হরনাথ রায়।




রাজবাড়িতে সাতটি আঙ্গিনা  তিনশটি কক্ষ ছিল।প্রাসাদের প্রধান ফটকে (দরজারোমান ঘরানার ৪টি পিলার (স্তম্ভরাজার রচিশীলতার পরিচয় বহণ করে। অট্টলিকার ভিতরের দালানগুলো তিন থেকে চার তলা বিশিষ্ট বলে ধারণা করা হয়।প্রাসাদের ভিতরে এখনো একটি সান বাঁধানো কূপ রয়েছে। রাজবাড়ির সামনে ছিল গোবিন্দ পুকুর। এই অঞ্চলের লোকজনদের আনন্দ দিতে ওই পুকুরের পাশেই ’গান বাড়িনামক একটি ঐতিহ্যবাহী দালান ছিল। তবেএখন তার কোন অস্তিত্ব নেই। রাজার গান বাড়ির শেষ সীমান্তে ছিল একটি কালি মন্দির। অবশ্য এখন তা পরিণত হয়েছে অবর্জনার ভাগাড়ে। এই কালি মন্দির থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থান ছিল রাজার বাগান বাড়ির।




জানা গেছেরাজা হরনাথের আমলে দুবলহাটির রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। রাজবাড়িটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে রাজা হরনাথ এখানে বিভিন্ন নাট্যশালা এবং স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিলেন। এই অঞ্চলের প্রজাদের খাবার পানির কষ্ট দূর করতে রাজপ্রাসাদের পাশের এলাকায় অনেক পুকুর খনন করেন তিনি।আর ১৮৬৪ সালে রাজপরিবারের উদ্যোগে একটি স্কুল স্থাপন করা হয়।পরে স্কুলটির নাম রাজা হরনাথ উচ্চ বিদ্যালয় রাখা হয়। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর রাজা হরনাথ রায় স্বপরিবারে ভারতে চলে যান। মোঘলরা হরনাথ রায় চৌধুরীকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।




তবেবর্তমানে রাজবাড়িটির অবস্থা খুবই করুণ আর দুর্দশাগ্রস্থ। জমিদারি বিলুপ্তির পর সরকার রাজবাড়িকে সরকারি সম্পদ হিসেবে প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের অধীনে নেয় ,ওপ্রত্মতত্ত্ব বিভাগ দায়িত্ব নিলেও রাজবাড়িটির কোন সংরক্ষণ বা সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি স্থানীয় প্রভাবশালীদের কবলে পড়ে দিন দিন রাজবাড়ির মূল্যবান সম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে।




নওগাঁর সামাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর বারী জানানসংস্কারের অভাব আর কর্তব্যরত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রাজবাড়িটি।সন্ধ্যা নামলেই বসে মদজুয়া আর গাঁজার আসর। কেউ দেখার নেই। কারো মাথাব্যথাও নেই।তবেঐতিহাসিক স্থাপনাটির সংস্কার করা হলে একে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র বলেও অভিব্যক্ত প্রকাশ করেন তিনি।




আমিনুল জুয়েল