একজন সাংবাদিকের চোখে বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ উঠলেই যেটা আমায় খুবই ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করে, তা হলো বাংলাদেশের জাতির পিতাকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করার পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরপরই তাকে তার দেশ গড়ার কাজে নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাকে নাজেহাল করা ও সুপরিকল্পিতভাবে এক কঠিন চক্রব্যূহর মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়, যাতে তিনি সদ্য স্বাধীন হওয়া এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে না পারেন এবং তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যাতে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পর্যবসিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে ৯ মাসের মাথায় সাফল্য লাভ করে এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হবে- এই ধারণা শুধু পাকিস্তানপন্থি মানুষজনেরই ছিল না, ছিল না শাসক দল আওয়ামী লীগের কিছু ডানপন্থি প্রভাবশালী নেতাদেরও। যেমন খোন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম, এমন কী ওবায়দুর রহমান ও আবদুল মালেক উকিলেরও। কোরবান আলির মতো কিছু নেতা ছিল, যারা সুযোগের অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে ছিল। তারা যখন দেখল বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর দেওয়া প্রস্তাব Loose confederation প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তান থেকে লন্ডন রওনা হচ্ছেন, তখন তারা বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্তটি মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারেনি। তারা চেয়েছিল বাংলাদেশ যেন পাকিস্তানের সঙ্গে ক্ষীণ সম্পর্ক বজায় রাখে শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে। বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র করাতে তারা খুবই ক্ষুব্ধ হয়।
ফলে তারা শুরু করল বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বোনা। শুধু তারাই নয়; তাদের কাছের সচিব আমলারা যেমন মাহবুব আলম চাষীর মতো লোকেরা আপ্রাণ চেষ্টা করল যাতে দেশ গড়ার যে বিশাল কর্মযজ্ঞ বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন, সেটাকে কীভাবে বানচাল করা যায়। দেশ স্বাধীন হবার পর মানুষের মনে যে উন্নত জীবনযাপনের আশা সঞ্চারিত হয়েছিল তা যাতে সার্থক না হয়ে ওঠে এবং ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যাতে তিনি এক ব্যর্থ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিগণিত হন। সেটা তুলে ধরতে ওই গোষ্ঠী উঠেপড়ে লেগে যায়। যাতে দেশের মানুষের মনে বঙ্গবন্ধুর যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল তা যাতে বিশাল ধাক্কা খায়, তা সুনিশ্চিত করা। বঙ্গবন্ধুর প্রতি দেশের মানুষের যাতে মোহভঙ্গ ঘটে, তা ত্বরান্বিত করার জন্য নানান কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়।

আমি ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ জুন মাস পর্যন্ত দ্য স্টেটসম্যানের ব্যুরো চিফ হিসেবে ঢাকায় কাজ করি। সেই কৌশলগুলোকে খুব কাছ থেকে কীভাবে কার্যকর করা হচ্ছে তা দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। তার দলের মোশতাকরা জানতো বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা খুবই কঠিন কাজ। বঙ্গবন্ধুর আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আওয়ামী লীগে থেকে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করা বা এমন কী বিরোধিতা করা মানুষ ভালোভাবে নেবে না। ফল উল্টো হবে। সুতরাং সোজা আঙুলে যখন ঘি উঠবে না তখন আঙুল ট্যাড়া করে তা তুলতে হবে।
শুরু হলো নানান নোংরা কৌশলের খেলা। মোশতাক-চাষী গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে হাত মেলাল। জামাত, চিনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে একের পর এক থানা আক্রমণ, অস্ত্রশস্ত্র লুঠ, ব্যাংক ডাকাতি, পাট গুদামে আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করা প্রায় এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় দাঁড়াল। কিন্তু মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী মিথ্যে গুজব ছড়িয়ে দিল- এসব কাজ মুক্তিযোদ্ধাদের। বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার জন্য এমন কথাও চালু করা হলো যে ব্যাংক ডাকাতির নেতৃত্ব দিচ্ছে শেখ কামাল ও জামাল। ঢাকায় তখন দামি বিদেশি গাড়ি প্রায় রোজ হাইজ্যাক হচ্ছে। বাজারে কথা ছড়ানো হলো- শেখ কামাল নিজে হাইজ্যাক করে গাড়িগুলোকে ধানমন্ডির ৩২নং নিজেদের বাড়িতে জড়ো করছে। আর বঙ্গবন্ধু পুত্রস্নেহে অন্ধ হয়ে এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন। এসব গুজব সুকৌশলে এমনভাবে ছড়ানো হলো যে লোক এসব ডাহা মিথ্যাচার বিশ্বাস করতে শুরু করল। এমনও বলা হলো যে কোনো সুন্দরী তরুণী বা গৃহবধূকে নাগালে পেলে বঙ্গবন্ধুর পুত্রদ্বয় তাদের ছাড়ে না।
রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণের জন্য মোশতাকরা মওলানা ভাসানীর শরণাপন্ন হলো। কারণ মওলানা সাহেবের মতো ওজনদার নেতা মুজিববিরোধী কথা বললে তা সাধারণ মানুষ ‘নেবে ও ভালোভাবে খাবে’। কারণ মওলানা প্রকাশ্যে বলতেন, তিনি ‘মুজিবকে পুত্রবৎ স্নেহ করেন’। ‘তিনি তার রাজনৈতিক গুরু’। ফলে শুরু হলো নিয়ম করে ‘হুজুরের’ মুজিববিরোধী প্রচার ও গালাগাল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার দেড় মাস পরেই মওলানা সাহেব ঢাকার পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভা করেন যেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘জালেম’ বলতেও ছাড়েন নি। বঙ্গবন্ধু কি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন তার প্রশংসা না করে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশকে কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র করা হলো তার কৈফিয়ৎ চাইলেন তিনি। নিজেই কৈফিয়ত দিয়ে বললেন, ‘মুজিব তুমি বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে বেইমানি করেছো। তাদের নামাজ-রোজা ও মুসলিম আদব-কায়দা কেড়ে নিতে চাইছো। বাঙালি মুসলমান তোমায় কোনোদিন ক্ষমা করবে না। তুমি হিন্দুস্তানের ওই মহিলা প্রধানমন্ত্রীর কথায় দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ বানাতে চাইছো। তা কোনোদিন হবে না। আমরা বাংলাদেশকে মুসলিম বাংলা বানিয়েই ছাড়বো।’ মওলানা সাহেবের এসব কথা বাংলাদেশের সংবাদপত্রে ব্যানার হেডলাইন করে ছাপাত। তার মুখপত্র ‘হক কথা’ তার বিভাজনের রাজনীতির বক্তব্য বিশাল আকারে ছাপাত। আর ছাপতো তার ভারত-বিরোধী অপপ্রচার। ভারত না-কি বাংলাদেশকে লুটেপুটে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় সেনা খানসেনাদের মতো বাংলার মায়েদের ইজ্জত লুটছে। বাংলাদেশের মাছ সবজি ডিম চাল তেল এমন কী লবণও ভারতে চোরাচালান করে নিয়ে যাচ্ছে। তার ভারত-বিরোধী প্রচার এমন এক আকার নিল যে ঢাকাস্থ তদানীন্তন ভারতীয় হাইকমিশনার সুবিমল দত্ত বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে আর্জি জানালেন যে এসব ভিত্তিহীন অপপ্রচার যদি বন্ধ করা না হয়, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে চিড় ধরতে বাধ্য।
বঙ্গবন্ধু সুবিমল বাবুকে বলেন, একটা গভীর চক্রান্ত তার পরিবার ও সরকারের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে। ‘আপনি দেখছেন না আমি মওলানা সাহেবের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কীভাবে সোচ্চার হয়েছি। রোজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে মানুষকে বোঝাচ্ছি ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। যে যার নিজের ধর্ম চর্চা করতে পারবে। আসলে মওলানা সাহেবকে এক দুষ্টচক্র কব্জা করেছে। তিনি তাদের খপ্পরে পড়ে মানুষকে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপানোর কাজে নেমেছেন।’ বঙ্গবন্ধু সুবিমল বাবুকে কারও নাম না করে বললেও, আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ওই দুষ্টচক্রকে কারা মদত জোগাচ্ছে। কিন্তু পরে সুবিমল বাবু আমাকে বলেছিলেন, ‘মোশতাক রং ঃযব ারষষধরহ ড়ভ ঃযব ঢ়রবপব’ যদিও সে মন্ত্রিসভার ক্যাবিনেট মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধুকে চীনপন্থি কমিউনিস্ট ও মওলানার বিরুদ্ধে ‘কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা নেবার জোরদার দাবি জানাত’।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অন্য একটি একান্ত বৈঠকে সুবিমল বাবুকে শুনতে হয়েছিল বাংলাদেশের জাতির পিতার দুঃখের কথা। ‘কোথায় সবাই মিলে আমাকে দেশ গড়ার কাজে সাহায্য করবে। কিন্তু তা না করে কিছু কিছু লোক সব ঘেটে দিতে চাইছে। তাদের সহ্য হচ্ছে না যে আমি দেড় বছরের মধ্যে দেশকে এক নতুন সংবিধান দিয়েছি। দুই হাজার বিধ্বস্ত সেতু পুনর্নির্মাণ করেছি এবং দেশের বিপর্যস্ত যোগাযোগ-ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছি। একটি নব্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখতে সফল হয়েছি, সেটা অনেকের চক্ষুশূলের কারণ। আমি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাঙালির ধর্মীয় বিভাজনকে ধূলিস্যাৎ করেছিলাম তাকে পুনর্বহাল করার জন্য মওলানা সাহেব মরিয়া হয়ে পড়েছেন।
বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশের মূল কা-ারির দায়িত্বে তখন দেশটিতে সব কিছুরই অভাব। অর্থাৎ নেই নেই এর সময় চলছে। তখন গ্রাম বাংলায় শাড়ির দারুণ অভাব। বঙ্গবন্ধু একটি সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-র কর্মকর্তাদের কলকাতায় পাঠালেন, যাতে তারা সেখানকার বাজার থেকে জরুরিভিত্তিতে শাড়ি কিনে দেশে শাড়ির অভাব দূর করা যায়। কিন্তু টিসিবি’র ওই কর্মকর্তারা যা করলেন তা কহতব্য নয়। তারা হাওড়া হাটে পাইকারি দরে সবচেয়ে নিকৃষ্টমানের শাড়ি কিনে দেশে পাঠালেন, যা দিয়ে লজ্জা নিবারণ করা ছিল অসম্ভব। ঢাকার প্রধান দৈনিকগুলোতে প্রথম পাতার শিরোনাম ছিল ‘মুজিবের ভারত থেকে আমদানি করা জনতা শাড়ি মায়েদের লজ্জা নিবারণে ব্যর্থ’।
সবচেয়ে সস্তা দরের শাড়ি আমদানি করে ওই কর্মকর্তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারলো। তখন গরিষ্ঠ সরকারি আমলাদের এক বৃহদাংশের মুজিব ও তার সরকার-বিরোধী মনোভাবাপন্নদের দ্বারা প্রভাবান্বিত। ফলে তারা শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করতে সক্ষম হলো না, সঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে কুৎসা ও অপপ্রচারের ঝড় তুলল। বলা হলো, বাংলাদেশকে উচ্ছিষ্টমানের শাড়ির বাজারে পরিণত করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী ও মুজিব নিম্নমানের জনতা শাড়ির জোগানের ব্যবস্থা করেছেন। মওলানা সাহেব ও অন্য বিরোধী নেতারা জনতা শাড়িকে হাতিয়ার করে বঙ্গবন্ধু ও ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। মওলানা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তোপ দেগে বললেন, ‘মুজিব তুমি ভারতের খপ্পরে পড়ে পচা শাড়ি আমদানি করে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত লুটেছো। এর ক্ষমা নেই। ফলে তোমাকে একদিন এর জন্য বিশাল খেসারত দিতে হবে।’
জনতা শাড়ি নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও ভারতকে এমনভাবে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো যে দুদেশের মধ্যে এক কূটনৈতিক যুদ্ধ শুরু হলো। সুবিমল দত্তকে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে হলো, ‘ভারতে উচ্চ ও নিম্নমানের দু-ধরনেরই শাড়ি পাওয়া যায়। যে যেটা চায় সেটা কিনতে পারে। টিসিবি’র কর্মকর্তারা যেটা পছন্দ করেছেন সেটাই কিনেছেন। এতে ভারতের কোনো ভূমিকা নেই। কেন নিম্নমানের শাড়ি তারা কিনলেন সে-জন্য তাদের কাছে কৈফিয়ত করা উচিত।
বঙ্গবন্ধুকে পদে পদে ভালো কাজে শুধু বাধা দেওয়াই নয়, তাকে কীভাবে সব সময় ব্যতিব্যস্ত ও হেনস্তা করা যায় এটাও ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি তো অসহায় হয়ে পড়েছিলেন, সেটা তার তখনকার বক্তৃতা থেকে বুঝতে পারতাম। তখনকার জনসভায় তার বক্তব্য একটা বাঁধা গৎ ধরে চলত- ‘আমি আগামী তিন বৎসর আপনাদের কিছুই দিতে পারব না, কারণ আমার ভাঁড়ারে কিছুই নাই। আর আমি কষ্টেশিষ্টে আপনাদের জন্য যা জোগাড় করে আনি তা আপনাদের কাছে পৌঁছায় না। কারণ তা আপনাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই আমার সরকারের কিছু কর্মকর্তা তা কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়। ভালো কথা বলে এদের শায়েস্তা করা যাবে না। কারণ চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি।’ ঢাকার একটি জনসভায় একদিন চমক দিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার সহ্যের সীমা ভেঙে পড়ছে। আমি চোর বাটপারদের লাল ঘোড়া দিয়ে দাবড়িয়ে দেব।’ লাল ঘোড়াটা কি সেটা তিনি তার বক্তৃতায় উহ্য রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সুবিমল বাবুকে বলেছিলেন, ‘আমার পুনর্নির্মাণের কার্যক্রম ও উন্নয়নের প্রক্রিয়া যাতে ব্যাহত হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য ওই “দুষ্টচক্র” আদাজল খেয়ে নেমেছে। তারা চায় দেশে রাজনৈতিক অশান্তি ও অস্থিরতা। তারা দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ না হলে আমার জাহাজমন্ত্রী আপনাদের দেওয়া মালবাহী জাহাজ “বাংলার দূত” নিয়ে প্রকাশ্যে কেন ওইসব কটূক্তি করবেন। আপনাদের প্রচুর সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আপনারা ওই জাহাজটা আমাদের দান করেছেন, যাতে আমাদের নিজস্ব মালবাহী জাহাজের বহর গড়ে ওঠে। শ্রীমতী গান্ধীকে আমি এর জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছি; কিন্তু আমার মন্ত্রী ওইসব কু-কথা বলে আমার মুখ পুড়িয়েছে।’
তাজউদ্দীন আহমদ একান্তে সুবিমল বাবুকে বলেছিলেন, ‘আমি অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে ধরনের নিঃসঙ্গতায় সেই ৯ মাস কাটিয়েছিলাম, বঙ্গবন্ধুও সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে খুবই একাকীত্ববোধে ভুগছেন। এক সময় যারা তার খুব কাছের লোক ছিল, আজ তারা তাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। অনেকে গেছে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার জন্য; কয়েকজন গেছে মতের অমিলের জন্য, যদিও তারা মন-প্রাণ দিয়ে তাকে ভালোবাসেন এবং তার জন্য তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি।’
১৯৭৪-এর মার্চ মাসে যেদিন বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি (OIC) সম্মেলনে নিজে গিয়ে তা যোগদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন, সেদিন আমি ঢাকায় সরকারি সচিবালপয় খোন্দকার মোশতাকের তার ইডেন বিল্ডিংয়ের দপ্তরে তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। আমাকে দেখামাত্র বলে উঠলেন, ‘বাবু মানস ঘোষ, আপনাদের পিতামহের (সুবিমল দত্তকে তার অশীতি বৎসর বয়স্কর জন্য তাকে অনেকে ওইভাবে সম্বোধন করত) শত শত চেষ্টা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানে গিয়ে ওআইসি সম্মেলনে যোগদান আটকানো গেল না। দেখুন না লোকেরা তার সিদ্ধান্তে কতটা খুশি হয়ে মহল্লায় মহল্লায় আহ্বান জানাচ্ছে মাইকে গান বাজিয়ে। আপনারা চাননি তিনি পাকিস্তান যান। কিন্তু আমার সাধারণ মানুষরা চেয়েছে তিনি যান। পাকিস্তানের সঙ্গে এতদিনের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করুন। সেটাই হতে যাচ্ছে। উনি লাহোর যাবেন। ভুট্টো ঢাকায় আসবেন। পিতামহকে বলুন ভারতের খেলা বরবাদ হয়ে গেল।’ সুবিমল বাবুকে যখন মোশতাকের কথাগুলো বললাম, তিনি তা চুপ করে শুনলেন আর বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু যা ভালো বুঝেছেন তাই করেছেন। আমাদের কী করার আছে?’
আমি মোশতাকের ব্যাপারটা যখন ন্যাপের প্রধান প্রফেসর মোজাফ্ফরকে জানাই, তিনি বিস্মিত না হয়ে বললেন, ‘একাত্তরে মোশতাক যে কাজটা করতে ব্যর্থ হয়েছিল আপনাদের জন্য, সেটা এবার সফল করে দেখাল। আপনাদের আউট ম্যানুভার করল।’ আলি আকসাদেরও একই কথা ছিল।
সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত মোশতাকের কথা নিয়ে ভেবেছি এবং বিস্ময়ের সঙ্গে নিজেকে প্রশ্ন করেছি বঙ্গবন্ধু কাদের সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকার চালাচ্ছেন? এরা তো তার সব ভালো কাজকেই স্যাবোটাজ করে দেবে। কিন্তু মোশতাককে তিনি প্রচুর গুরুত্ব ও মান্যতা দেন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের জন্য এক ভয়ঙ্কর দিন আসছে সেটা সেদিন রাতে গভীরভাবে অনুভব করি এবং শিউরে উঠি।
চিলির রাষ্ট্রপতি স্যালভাদোর আয়েন্দের হত্যা বঙ্গবন্ধুকে বেশ বিচলিত করেছিল। ঢাকার রমনা উদ্যানে ছাত্র ইউনিয়নের কাউন্সিল মিটিং উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি আয়েন্দে হত্যাকা-ে যে বিদেশি শক্তি জড়িত, তা তিনি বারবার উল্লেখ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘোলাজলে মাছ ধরতে চাইছে, নানা ধরনের সংকট সৃষ্টি করে সেটারও উল্লেখ ছিল তার বক্তৃতায়। শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলো একত্র হয়ে বাংলাদেশে যে অঘটন ঘটাতে চাইছে, তার আঁচ তিনি আগেই পেয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিতে তিনি ব্যর্থ হন। তার আত্মবিশ্বাস তাকে এতটাই আত্মতৃপ্ত করে রেখেছিল যে তার বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হঠকারী ও অবিচক্ষণতার পরিচায়ক ছিল।
সবশেষে বলতে হয় জাতির পিতা ও ‘প্রধান সেবক’ হিসেবে তাকে দেশ গড়ার কাজে যে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল সেটা তার জাত শত্রুরা এমন কী দেশের সাধারণ মানুষও তাকে দেয়নি। যদি দিত তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান আজ উজ্জত দেশের সারিতে হতো।
বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি নিজেকে সংযত ও স্বচ্ছ রেখে এবং মানবিকতার পরিচয় দিয়ে প্রচুর অসাধ্য সাধন করেছেন। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই রমনার গণভবনে যখন তার প্রধানমন্ত্রীর দফতর ছিল তখন তিনি জনতার সরকারের প্রথা চালু করেন। কিন্তু তিন-চারটে সিটিং-এর পরেই সেই দরবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ দেশের দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর গরিব মানুষ তাদের আর্জি নিয়ে আসত বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপের জন্য, যাতে সেগুলো মুশকিল আসান হয়ে যায়। প্রথম দুটি সিটিং-এ আমি উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই ‘পাগলামির’ কারণ বোঝার চেষ্টা করেছি। ‘পাগলামি’ কথাটা আমার দেওয়া নয়। তার মন্ত্রিসভার এক ঘনিষ্ঠজনের দেওয়া। তখন দেখেছি বঙ্গবন্ধু দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খোঁজখবর নিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সব ঘটনার খোঁজখবর নিয়ে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নানকে বলতেন যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিত। তিনি দেশের আসর যুক্তিটা কি তা নিজে দরবারের নিরিখে হৃদয়াঙ্গম করার চেষ্টা করতেন। এবং তা করতে অনেকটা সক্ষমও হয়েছিলেন। মনে আছে রংপুরের এক চাষি তার জোতদারের দ্বারা উৎখাত হওয়ায় তার পায়ে পড়ে ভিক্ষা চেয়েছিলেন ‘আমাকে আমার জমি ফিরিয়ে দিন।’ সঙ্গে সঙ্গে রংপুরের মন্ত্রী মতিউর রহমানকে বঙ্গবন্ধু ডেকে বললেন, ‘এই গরিব-দুঃখী চাষির জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। ওর মুখে হাসি ফুটানোটাই আমার সরকারের লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধুর কথা শুনে ওই বর্গাদার পরিতৃপ্তির হাসি নিয়ে গণভবন ছেড়েছিল। আরও একটি দৃশ্য দেখে আমি হতবাক হয়েছিলাম। ’৭২-এর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে তাকে তার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে যেভাবে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখেছিলাম, তা দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছিলাম। অবাক হয়ে ভেবেছিলাম সাড়ে ৭ কোটি মানুষের নেতার হৃদয়টা কতটা কোমল হলে আদ্যপান্ত বাঙালি কায়দায় সকলের সামনে মা-বাবার পা ছুয়ে তাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন। তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী হয়েছিলেন। কারণ তিনি কখনও কপটতার আশ্রয় নিয়ে তাদের ধোঁকা দেবার বা বোকা বানাবার চেষ্টা করেননি। স্বাধীনতার পরপর তিনি প্রতিটি জনসভায় বলতেন, ‘আমি নিঃস্ব, রিক্ত। দিবার কিছু নাই। আপনারা চাইলেও আগামী তিন বছর কিছু দিবার পারব না। আপনারা আমার এই প্রস্তাবে রাজি তো?’ সমবেত জনতা হাত তুলে ‘জী আমারা রাজি’ বলে ‘তাদের সম্মতি জানাত। তার প্রতি সাধারণ মানুষের কতটা আস্থা ও বিশ্বাস ছিলÑ তার এই আবদার সম্মান দেওয়ার থেকেই বোঝা যায়।
চেন্নাই
লেখক : ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক, বাংলা স্টেটসম্যান পত্রিকার সাবেক সম্পাদক